কুমিল্লা, ৩ মার্চ ২০২৬: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলামের কড়া মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ঝড় তুলেছে। তিনি বলেছেন, "পুরোনো সংবিধানের কথা বললে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে হবে।" কুমিল্লা স্টেশন ক্লাবে ইফতার মাহফিলপূর্ব সমাবেশে এই বিস্ফোরক বক্তব্য দিয়ে তিনি বিএনপিকে সতর্ক করেছেন এবং ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে নাহিদের কথায় উঠে এসেছে গণভোট, সংস্কার এবং বিচারের দাবি। কী বললেন তিনি এবং কেন এই মন্তব্য? আসুন বিস্তারিত জেনে নিই।
সংবিধান নিয়ে চ্যালেঞ্জ: হাসিনাকে মেনে নেবেন কি?
নাহিদ ইসলাম বলেন, "যদি পুরোনো সংবিধানের কথা বলা হয় তাহলে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকেই এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে হবে। আপনারা কি সেটা মেনে নেবেন? সংবিধান অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয় নাই, প্রধান বিচারপতি হয় নাই, তারেক রহমানের সরকারও সংবিধান অনুযায়ী হয় নাই।" তিনি আরও যোগ করেন, গণভোট, বিচার এবং সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। শেখ হাসিনার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলেন, "অযথা পানি ঘোলা করবেন না। গণভোটে আমরা 'হ্যাঁ' এর পক্ষে ছিলাম এবং তা জয়যুক্ত হয়েছে। কিন্তু গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে আদালতে। আমরা সেটা মানব না। জনগণের ম্যান্ডেটকে আদালতে নিয়ে আদালতকে বিতর্কিত করবেন না।" তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণের রায়কে আদালতে নিলে রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন। সংসদকে সংস্কার পরিষদ হিসেবে ঘোষণা করে গণরায় অনুযায়ী সব সংস্কার বাস্তবায়নের দাবি জানান।
বিএনপিকে সতর্কতা: পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করবেন না
বিএনপির উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, "আপনারা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবেন না। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার জন্য ভারতের কাছে অবিলম্বে দাবি জানাতে হবে। তাকে ফেরত না দিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না।" ভারতের প্রতি কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, "বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থানকে মেনে নিতে হবে এবং শরীফ ওসমান হাদির খুনিদের ফেরত দিতে হবে। তারপরেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিবেচনা করা হবে।"
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথিদের মন্তব্য: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এনসিপির ১০ দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই ইফতার মাহফিল আয়োজিত হয়। বিশেষ অতিথিরা ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাছির উদ্দিন পাটোয়ারী প্রমুখ।
সারজিস আলম বলেন, "আমরা বাংলাদেশকে চব্বিশের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে বাস্তবায়ন করতে চাই। আগামী স্থানীয় নির্বাচনে জয়লাভ করতে হবে।" আসিফ মাহমুদ বলেন, "গণভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজপথে প্রস্তুত।" নাছির উদ্দিন পাটোয়ারী বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আপনারা শহীদ জিয়া এবং খালেদা জিয়ার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছেন। শহীদ উসমান হাদির বিচার নিশ্চিত করতে হবে।" হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, "গণভোটের রায় অনুসারে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে। ইনসাফের সমাজ গড়তে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।" আখতার হোসেন বলেন, "পূর্বের বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাই না। এনসিপি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করছে।"
বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক প্রভাব কী?
এই মন্তব্যগুলো বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গণভোটের বৈধতা নিয়ে আদালতে চ্যালেঞ্জ এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের শর্তাবলী নিয়ে নাহিদ ইসলামের অবস্থান স্পষ্ট করে যে, এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থানের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি বিএনপি এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে পারে, বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের প্রাক্কালে। কূটনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের এই শর্তগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই তোপদাহের পর রাজপথ কতটা উত্তপ্ত হয়।