অ্যাঙ্গোলার রাজধানী লুয়ান্ডায় ট্যাক্সি চালকদের তিন দিনের ধর্মঘটের প্রথম দিনে ব্যাপক লুটপাট, ব্যারিকেড, টায়ার জ্বালানো এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে এই ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়। অ্যাঙ্গোলা জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, তারা বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে শহরের কিছু এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই ঘটনার তীব্রতা প্রকাশ পেয়েছে।
পুলিশের বিবৃতি
জাতীয় পুলিশের মুখপাত্র ডেপুটি কমিশনার মাতেউস রড্রিগেস সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সোমবার ভোর থেকে লুয়ান্ডা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর, দোকানে লুটপাট এবং রাস্তায় ব্যারিকেডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা এই ধরনের আচরণে জড়িত নাগরিকদের এই কার্যকলাপ বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।" পুলিশ তাদের সমস্ত সম্পদ এবং জনবল ব্যবহার করে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
রড্রিগেস জোর দিয়ে বলেন, এই ঘটনাগুলো শান্তিপূর্ণ ধর্মঘটের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তিনি বলেন, "একটি শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট এক জিনিস, কিন্তু আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি তা হলো চুরি, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং সহিংসতার মতো প্রকৃত ভাঙচুর।" সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত আহত ব্যক্তিদের ছবি সম্পর্কে তিনি বলেন, একজন নাগরিকের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। তবে, গ্রেপ্তারের সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ অভিযান এখনো চলমান।
ধর্মঘটের প্রভাব
ধর্মঘটের ফলে লুয়ান্ডায় পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেকে কাজে যেতে দীর্ঘ দূরত্ব হাঁটতে বাধ্য হয়েছেন, কেউ কেউ ট্যাক্সি স্টপে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করেছেন। সরকারি বাসে যাত্রীদের চাপ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। পাইশো মাতেউস নামে একজন ৩৭ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি বলেন, "আমি তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছি। বাসগুলো পূর্ণ, এবং আমি এখন কাজে যেতে পারছি না।"
ভিয়ানা থেকে জাঙ্গো পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া ২৫ বছর বয়সী ভিটর মিগুয়েল বলেন, "আমি ভোর পাঁচটায় উঠেছিলাম কাজে যাওয়ার জন্য, কিন্তু ধর্মঘটের কারণে হাঁটতে হয়েছে। এটা খুবই কঠিন দিন।" তিনি ট্যাক্সি ভাড়া বৃদ্ধির সমালোচনা করেন।
ভাঙচুর ও লুটপাট
ক্যালেম্বা ২ এলাকায়, রুয়া ১১ ডি নভেম্ব্রো রাস্তায় ব্যারিকেড, ভাঙা গাছ এবং জ্বলন্ত টায়ার দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিছু নাগরিক এবং মোটরসাইকেল ট্যাক্সি চালকরা ব্যারিকেড তৈরি করে যানবাহনের উপর হামলা চালিয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি চালিয়েছে, তবে তাদের সীমিত জনবলের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, দোকানে লুটপাট, বাসে পাথর ছোঁড়া এবং রাস্তায় ব্যারিকেডের দৃশ্য।
অ্যান্টোনিয়া জর্জ নামে একজন পথচারী ক্যালেম্বা ২-এ একটি সুপারমার্কেটে ভাঙচুরের নিন্দা জানিয়ে বলেন, "তারা কর্মচারীদের মারধর করেছে, এটা চুরি এবং ভাঙচুর। সুপারমার্কেটের সঙ্গে ট্যাক্সি চালকদের ধর্মঘটের কী সম্পর্ক?" তিনি পুলিশের হস্তক্ষেপের সমর্থন করেন।
ধর্মঘটের কারণ
এই মাসের শুরুতে, সরকার ২০২৩ সাল থেকে জ্বালানি ভর্তুকি হ্রাসের অংশ হিসেবে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ কোয়ানজা করেছে। এর ফলে শেয়ার্ড ট্যাক্সির ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ কোয়ানজা এবং শহুরে বাসের ভাড়া ১৫০ থেকে ২০০ কোয়ানজা করা হয়েছে। ট্যাক্সি চালকরা দাবি করেছেন, সরকার তাদের অভাব-অনটনের কথা শোনেনি, যার ফলে তারা ২৮ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ট্যাক্সি চালক জোয়াকিম কাতিম্বা বলেন, "আমরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন ট্যাক্সি ভাড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি। আমরা শ্রমশক্তির প্রতি বেশি সম্মান চাই।" তিনি কিছু সহকর্মী যারা ধর্মঘট ভাঙার চেষ্টা করেছেন তাদের সমালোচনা করেন।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে, এই ধর্মঘট শুধু জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকারের নীতি, পুলিশি হয়রানি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার বিরুদ্ধেও জনগণের ক্ষোভের প্রকাশ।
সামাজিক মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং ছবিতে দেখা গেছে, লুয়ান্ডার রাস্তায় জ্বলন্ত টায়ার, ভাঙচুর করা দোকান এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের দৃশ্য। কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে, এই ধর্মঘট কেবল ট্যাক্সি চালকদের নয়, বরং সাধারণ জনগণের ক্ষোভের প্রকাশ, যারা ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। একটি পোস্টে বলা হয়েছে, "যা ট্যাক্সি ধর্মঘট হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা এখন 'স্বৈরাচারের পতন' স্লোগানে জনগণের পূর্ণাঙ্গ ধর্মঘটে পরিণত হয়েছে।"
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, এই ধর্মঘট অ্যাঙ্গোলার তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) চাপে জ্বালানি ভর্তুকি হ্রাসের ফলে জনগণের উপর অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে।
সরকার ও জনগণের প্রতিক্রিয়া
লুয়ান্ডা সরকার নাগরিকদের সহিংসতা এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সরকার দাবি করেছে, এই বিক্ষোভে বিরোধী দলগুলো জনগণকে উস্কানি দিচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে সরকারের এই বক্তব্যের সমালোচনা করা হয়েছে, এবং কিছু ব্যবহারকারী এই ঘটনাকে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জন অসন্তোষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
২২ বছর বয়সী বেকার নারী ভালেরিয়া ড্যানিয়েল বলেন, "জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে জনগণ খুব ক্ষুব্ধ। এই বিদ্রোহ সরকারকে তাদের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।" তিনি আরও বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, যা অনেক পরিবারের জন্য কষ্টকর।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া
পুলিশ জানিয়েছে, তারা ধর্মঘটের শেষ দিন বুধবার পর্যন্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করবে। মাতেউস রড্রিগেস বলেন, "হুমকির মাত্রা বাড়লে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।" পুলিশ লুয়ান্ডা সরকারের সদর দফতরের কাছে মোটরসাইকেল ট্যাক্সি চালকদের একটি দলের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ থামাতে গুলি চালিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কভারেজ
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই ধর্মঘটকে অ্যাঙ্গোলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ধর্মঘটের ফলে যাত্রীরা লুয়ান্ডায় আটকা পড়েছেন, এবং সহিংসতা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া উল্লেখ করেছে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ১২ জুলাই লুয়ান্ডায় বিক্ষোভে পুলিশ কঠোরভাবে দমন করেছে, যাতে বেশ কয়েকজন আহত এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন।
অ্যাঙ্গোলার সংবাদমাধ্যম ভের অ্যাঙ্গোলা এবং লুয়ান্ডা জার্নাল এই ঘটনাকে জনগণের ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে, অ্যাঙ্গোলার মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপে সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং সেন্সরশিপের অভিযোগ রয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতাকে সীমিত করে।
তথ্য যাচাই
সামাজিক মাধ্যমে কিছু পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে এই ধর্মঘট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। তবে, এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ যাচাই করা যায়নি, কারণ এগুলো প্রাথমিকভাবে সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের উপর নির্ভরশীল। অ্যাঙ্গোলার সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে এই ঘটনাকে প্রাথমিকভাবে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যদিও কিছু বিক্ষোভকারী সরকারের সামগ্রিক নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছে।
অ্যাঙ্গোলার ইন্টারনেট স্বাধীনতার উপর ফ্রিডম হাউসের ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুসারে, সরকার সমালোচনামূলক অনলাইন মতামত দমন করতে কঠোর আইন প্রয়োগ করে এবং সাংবাদিকদের উপর আইনি হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন করে। এটি সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার উপর প্রশ্ন তুলেছে।
উপসংহার
লুয়ান্ডায় ট্যাক্সি চালকদের ধর্মঘট জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক দুর্দশার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের প্রকাশ। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করছে, তবে সহিংসতা এবং লুটপাট শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারের নীতি পুনর্বিবেচনা এবং ট্যাক্সি চালকদের দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যম এই ঘটনাকে অ্যাঙ্গোলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন হিসেবে দেখছে।