আরব স্প্রিংয়ের ১৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, ২০১০-১১ সালের গণ-আন্দোলন পাঁচটি দেশের দীর্ঘদিনের শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। এই আন্দোলনের সূচনা হয় তিউনিসিয়ায় এক যুবকের আত্মাহুতি দিয়ে, যা পরে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনে এই পাঁচ নেতার ভাগ্যের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৪ সালে) ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও যুক্ত করা যায়, যাকে অনেকে ‘বাংলাদেশের আরব স্প্রিং’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিউনিসিয়ার জাইন আল-আবিদিন বেন আলি
ক্ষমতায় ছিলেন: ১৯৮৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত (২৩ বছর)।
কী ঘটেছিল: ২০১১ সালের জানুয়ারিতে এক মাসের অবিরাম বিক্ষোভের পর সৌদি আরবে পালিয়ে যান।
বর্তমান অবস্থা (২০২৫): নির্বাসিত অবস্থায় মারা গেছেন। ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জেদ্দায় ৮৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মিশরের হোসনি মোবারক
ক্ষমতায় ছিলেন: ১৯৮১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত (৩০ বছর)।
কী ঘটেছিল: ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮ দিনের বিক্ষোভের পর পদত্যাগ করেন।
-বর্তমান অবস্থা (২০২৫) : মারা গেছেন। দুর্নীতির অভিযোগে কারাবাসের পর ২০১৭ সালে মুক্তি পান এবং ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কায়রোতে ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
ইয়েমেনের আলি আব্দুল্লাহ সালেহ
ক্ষমতায় ছিলেন: ১৯৭৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত (৩৩ বছর)।
কী ঘটেছিল: ২০১১ সালের বিক্ষোভের পর ২০১২ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, পরে হুথি বিদ্রোহীদের সাথে জোট গঠন করেন কিন্তু ২০১৭ সালে সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
বর্তমান অবস্থা (২০২৫): নিহত। ২০১৭ সালে হুথি বিদ্রোহীরা ৭৫ বছর বয়সে তাকে হত্যা করে।
লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি
ক্ষমতায় ছিলেন: ১৯৬৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত (৪২ বছর)।
কী ঘটেছিল: ২০১১ সালের বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার পর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, ন্যাটো হস্তক্ষেপে ত্রিপোলি দখলের পর বিদ্রোহীরা তাকে ধরে ফেলে।
বর্তমান অবস্থা (২০২৫): নিহত। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর সির্তে বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন।
সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ
ক্ষমতায় ছিলেন: ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত (২৪ বছর)।
কী ঘটেছিল: ২০১১ সালের বিক্ষোভ দমনে নির্মমতার পর ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীদের আক্রমণে দামেস্ক দখল হয় এবং তিনি পালিয়ে যান।
বর্তমান অবস্থা (২০২৫): নির্বাসনে। পরিবারসহ মস্কোতে আশ্রয় নিয়েছেন, রাশিয়ার কঠোর নজরদারিতে আছেন। রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ এবং প্রকাশ্যে আসতে পারেন না।
বাংলাদেশের শেখ হাসিনা (সাম্প্রতিক ক্ষমতাচ্যুতি)
ক্ষমতায় ছিলেন: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত (১৫ বছর ধারাবাহিকভাবে, মোট ২০ বছরের বেশি)।
কী ঘটেছিল: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলন (কোটা সংস্কার থেকে সরকারবিরোধী) দমনে সহিংসতার পর ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যান।
বর্তমান অবস্থা (২০২৫): নির্বাসনে। ভারতের নয়াদিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে গোপন স্থানে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশ সরকার ভারতের কাছে এক্সট্রাডিশন চেয়েছে, কিন্তু ভারত সাড়া দেয়নি। অন্যান্য দুর্নীতি ও অপরাধের মামলায়ও সাজা হয়েছে।
পটভূমি এবং প্রভাব
আরব স্প্রিংয়ের মূল কারণ ছিল দুর্নীতি, বেকারত্ব, দমনমূলক শাসন এবং পুলিশি নির্যাতন। এই আন্দোলন পাঁচটি স্বৈরশাসককে ক্ষমতাচ্যুত করলেও অনেক দেশে অস্থিরতা এবং যুদ্ধ চলতে থাকে। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধে অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা বাস্তুচ্যুত হয় এবং শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হয়। ২০২৫ সালে সিরিয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন আহমেদ আল-শারা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ২০২৪-এর আন্দোলনও বেকারত্ব, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছিল, যা শেখ হাসিনার পতন ঘটায়। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে দেশ চলছে, এবং ২০২৬ সালে নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রতিবেদন আরব স্প্রিংয়ের উত্তরাধিকারকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যা গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছিল কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। (সূত্র: আল জাজিরা, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫; বিবিধ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম)